,



‘চোখ’ – কাজী শরীফ | Times Tribune

আমি তখন ব্রিটানিয়া ইউনিভার্সিটিতে পড়াই। শুক্রবার আমার ক্লাস নিতে হতো। সাপ্তাহিক শনি রবিবার আমার কর্মস্থলে বন্ধ থাকতো । শুক্রবার সকাল থেকে টানা দুটো ক্লাস নিয়ে জুমার নামাজ পড়েই বাসে উঠে যেতাম। ভাত খাওয়ার অপেক্ষা আমি কখনোই করতাম না। বাসায় কিছুটা আগে যাওয়ার জন্য ভাতের সাথে আপোষ করতে আমার বাধা ছিলো না! মধ্যবিত্তের আপোষ করতে করতে পাপোষ বানিয়ে ফেলা জীবনে এতটুকু আপোষ যতসামান্যই! ফেণীতে যাত্রী নেয়ার জন্য মিনিট দুই তিনেক বাস দাঁড়াতো। আমি তখনই কিছু একটা মুখে পুরে নিতাম।

কখনো কখনো বাসায় কাজ থাকলে কিংবা শুক্রবার হেতু দাওয়াত থাকলে নামাজের আগেই বাসে উঠে যেতাম। তখন এরশাদ সাহেবের উপর খুব রাগ হতো। বাংলাদেশে সাপ্তাহিক বন্ধ থাকতো রবিবার। তিনি এসে শুক্রবার বন্ধ ঘোষণা করলেন আর আমার কর্মস্থল স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে শুক্রবার খোলা থাকে ! শুক্রবার দুপুরের কোন দাওয়াতে যেতে পারতাম না বললেই চলে! তখন আফসোস করতে করতে বলতাম আমিও বিধবা হলাম আর দেশেও লাল শাড়ি বের হয়েছে!

কালেভদ্রে যে সপ্তাহে আগে বের হতাম সে সপ্তাহে অধিকাংশ শুক্রবারেই জুমার নামাজ মিস হয়ে যেতো! কুমিল্লায় আমি শুধু শুক্রবার দুপুরের অপেক্ষায় সারা সপ্তাহ থাকতাম। এখন যেমন থাকি বৃহস্পতিবার বিকেলের। বর্তমান চাকুরিতে অবশ্য শুক্রবার দুপুরের দাওয়াত মিস হয় না!

আমি বড় বিচিত্র জীবন যাপন করি। চাটগাঁ ছাড়া কোথাও আমার ভালো লাগেনা। কুমিল্লায় এত বছর ছিলাম কখনো কোথাও ঘুরতে যাইনি। নোয়াখালীর প্রায় এক বছরেও অফিস ও বাসায় ঢুকে প্রথম দিনই টানানো মশারির ভেতর ঢুকা ছাড়া আমার অন্য কোন কাজ নেই। আমার অন্যকিছু ভালোও লাগেনা!

ছোটবোন,স্ত্রী,মেয়েকে ছাড়া আমি কোথাও ঘুরতে যাইনা। মনে হয় আমি অল্প উপার্জনের মানুষ। কাছাকাছি দূরত্বের একটা সৌন্দর্য আমি দেখবো আর ওরা দেখবেনা তা হয় না। যা আমি দেখবো তা ওদেরও দেখার হক আছে। তাই ঘুরতে কিংবা বাইরে কোথাও খেতে গেলে আমার কাছে আমি,তুমি নেই। আমি আনন্দ পাই আমরায়!

অফিস থেকে বের হয়ে বাসে উঠলে কখন বাসায় পৌঁছাবো এটাই কেবল মাথায় ঘুরে! প্রতি সপ্তাহে বাসায় যাওয়ার পরও এমন ঘরকাতুরে মানুষ কেবল আমি আয়নার সামনে দাঁড়ালেই দেখি। যে কথা বলছিলাম কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডের কাউন্টারে একটা বাস ছেড়ে দিলে আধা ঘন্টা পর পরেরটা ছাড়তো। একটা মিস করলে আমি কখনো পরেরটার অপেক্ষা করতাম না!নুরজাহান হোটেলের সামনে শ্যামলী,হানিফ, এনা পরিবহনের টিকেট কাউন্টার আছে। নুরজাহান হোটেল থেকেই বহুবার গিয়েছি।

একবারের ঘটনা। নুরজাহান হোটেলের সামনে থেকে দুপুর পৌণে একটার দিকে হানিফ পরিবহনে উঠলাম। আমার কোণাকুণি সামনের সিটে বসেছেন হুজুরটাইপ একজন লোক। তিনি বাস ছাড়ার পরপরই সুপারভাইজারকে বললেন ভাই আমি জুমা পড়বো। নামাজের খুতবার আগে দাঁড়াবেন। সোয়া একটায় দাঁড়ালেই চলবে। বাস যখন চৌদ্দগ্রাম বাজার পার হচ্ছে তখন সোয়া একটা। তিনি উঠে গিয়ে সুপারভাইজারকে বললেন “ভাই সোয়া একটা বাজে। দাঁড়ান না! খুতবা না শুনলে জুমা সম্পূর্ণ হয় না! ”

আমার তখন চোখে ঘুম ঘুম ভাব। হালকা করে কানে বাজছে ভদ্রলোকের সাথে সুপারভাইজারের বাতচিত। শুধু সুপারভাইজার না আরো কয়েকজন যাত্রী বলছে নামাজ দেড়টায়। একটা পঁচিশে দাঁড়ালেই হবে। বাসের সে যাত্রীদের মত আমরা অনেকেই জুমার নামাজ পড়াটাকে দায়সারা গোছের বানিয়ে ফেলেছি। শুক্রবার দুপুরে খুতবার শেষদিকে মসজিদে ঢুকি ও ইমাম সাহেব সালাম ফেরানোর পর কত দ্রুত মসজিদ থেকে বের হওয়া যায় সে রাস্তা খুঁজি। আমি চোখ খুলেই বললাম সুপারভাইজার সাহেব, বাস দাঁড় করান। ওযু করার একটা সময় লাগবে তো!
ভদ্রলোক বললেন আমার ওযু আছে ভাই।

অন্যদের অব্যাহত একটা পঁচিশ দাবির মুখে আমার কন্ঠ হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো। বাস ড্রাইভার একটা পঁচিশে দেখেন রাস্তার পাশে মসজিদ পাচ্ছেন না! আরো মিনিট তিনেক পর ফেণীর ফতেহপুরের দিকে একটা মসজিদের পাশে গিয়ে দাঁড়ান। ততক্ষণে নামাজ প্রায় শেষ! ভদ্রলোক দৌড়ে গিয়ে নামাজ ধরতে ধরতে ইমাম সাহেব সালাম ফিরিয়েছেন!

বাসে এতগুলো পুরুষ মানুষ। কারো কোন বিকার নেই শুধু ওই ব্যক্তি ছাড়া। আমি বাসের জানালা দিয়ে কড়া রোদে দাঁড়িয়ে তাকে নামাজ আদায় করতে দেখছি। জুমা মিস করে ফেলায় সম্ভবত জোহরের নামাজ আদায় করছিলেন।

এতক্ষণ বাস একটা পঁচিশে দাঁড়াতে বলা লোকগুলো দ্রুত আশেপাশে চা দোকান খোঁজা শুরু করলো। কেউ কেউ বেনসন সিগারেট না পাওয়ায় বিরক্ত। গ্রামের দোকানে বেনসন না পাওয়া শীর্ষক হতাশা শুনলাম দুজনের গলায়। একজন বিস্কুট কীভাবে পাঁচ টাকা পিস হয় তা নিয়ে দোকানদারের সাথে ঝগড়া করছে। এক মহিলা বাচ্চার জন্য চিপস কিনতে এসেছেন। শুকনা সুপারি দিয়ে পান খাচ্ছেন দুজন। আর আমি জানালা দিয়ে ওই আল্লাহর বান্দাকে দেখছি। সুপারভাইজার ইমাম সাহেব কেনো নামাজ তাড়াতাড়ি শুরু করেছেন এটা নিয়ে রাগে গজগজ করছেন!

দশ মিনিট পর বাস ছাড়লো। সুপারভাইজার বারবার লোকটাকে শুনিয়ে বলছিলো “আইজকা আগে দাঁড়াই গেছে ইমাম সাব। ”

আমি ভেবেছিলাম ভদ্রলোক খুব রেগে যাবেন। আমাকে অবাক করে দিয়ে তিনি একটা কথাও বলেননি। শুধু মাথা নিচু করে নিজের আসনে বসে ছিলেন। আমার কোণাকুণি সামনের সিটে বসেছিলেন বলে আমি তাকে দেখছিলাম।
পুরোটা পথ আর মাথা তোলেননি। সুপারভাইজারও আর কিছু বলেননি। শুধু মসজিদ্দা স্কুল পার হওয়ার সময় বলেছিলেন আমাকে রয়েল সিমেন্ট কোম্পানির সামনে নামাই দিয়েন। ভদ্রলোক উঠে সামনে যাচ্ছিলেন। সুপারভাইজার তার ব্যাগটা হাতে নিয়ে বললো ভাই কিছু মনে করিয়েন না!

লোকটা আমাকে সর্বোচ্চ অবাক করে দিয়ে সুপারভাইজারের চোখের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কাঁপিয়ে দুই চোখে পানি ঝরিয়ে দিয়ে বললো “ভাই জুমার নামাজটা পড়তে পারলাম না!” একজন বাবা তার দুই দশক ধরে লালিত পালিত একমাত্র কন্যাকে পাত্রস্থ করার সময় “আমার মেয়েটাকে দেখে রেখো” বলতে যেভাবে কাঁদে একজন মানুষ এক ওয়াক্ত জুমার নামাজ পড়তে না পেরে যেনো তেমন আবেগেই কথাটা বললো!

বিশ্বাস করুন জঙ্গিদের ইসলাম রক্ষার জন্য এ আত্নাহুতি আমাকে প্রতি জুমায় মসজিদে নিয়ে যেতে পারেনি। আমাকে প্রতি শুক্রবার জুমার আজান দিলেই নামাজের কথা মনে করিয়ে দেয় ঐ দুই অশ্রুসিক্ত চোখ।

ঐ ঘটনা দেখে আমি টানা বেশ কিছুদিন নামাজ পড়েছিলাম। এরপর অলসতায় ধারাবাহিকতা রাখতে ব্যর্থ হয়েছি। এরপর থেকে আমি নামাজের আগে বাসে উঠলে আগেই ওযু করে উঠতাম যেনো ওযু করতে গিয়ে নামাজ মিস না হয়। এ ঘটনা থেকে জেনেছি জঙ্গিদের জীবন দেয়ার চেয়ে মুমিনের দুই চোখের ক্ষমতা অনেক বেশি।

এখনো প্রায়ই চোখের সামনে ভাসে অশ্রুতে ভেজা দুটো চোখ আর সে আক্ষেপ “ভাই জুমার নামাজটা পড়তে পারলাম না!”

TT/F

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ