,



সুনামগঞ্জে বাড়ছে পানি, ডুবছে গ্রাম

আমিনুল হক, সুনামগঞ্জ : অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জ পৌরসভার ৮০ ভাগ ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছে। শহরের নবীনগর, ধোপাখালী, ষোলঘর, কাজীরপয়েন্ট, তেঘরিয়া, সাববাড়িরঘাট, হোসেনবখত চত্বর, পশ্চিম হাজীপাড়া,জগন্নাথবাড়ি,জেলরোড, লঞ্চঘাট, সুরমা মার্কেট, হাছননগর, মল্লিকপুর, কালীপুর , রায়পাড়া, সোমপাড়া, আরপিননগর, বড়পাড়াসহ সবকটি আবাসিক এলাকার সড়ক ঢলের পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। নীচু এলাকার শতাধিক বাড়িঘরে ঢলের পানি প্রবেশ করেছে। পৌর এলাকার সড়ক গুলো পানিতে নিমজ্জিত থাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। শহরের লোকজন পায়ে হেঁটে পানি মাড়িয়ে বাসাবাড়িতে চলাচল করছেন।

জানা যায়, সীমান্তের ওপাড় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে সুনামগঞ্জ সদর, তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর,জামালগঞ্জ, ধর্মাপাশা, দোয়ারাবাজার, জগন্নাথপুর, ছাতক,শাল্লাসহ ৯টি উপজেলার ২৯ টি ইউনিয়নের ৪৪ হাজার ১১০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এগুলো হলো সদর উপজেলার গৌরারং, সুরমা, জাহাঙ্গীরনগর, রঙ্গারচর ইউনিয়ন ও সুনামগঞ্জ পৌর এলাকার ৫ হাজার পরিবার, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ফতেহপুর, ধানপুর,সলুকাবাদ,পলাশ দক্ষিণ বাদাঘাট ইউনিয়নের ৫ হাজার পরিবার, জামালগঞ্জ উপজেলার বেহেলী ও ফেনারবাক ইউনিয়নের ৪০০ পরিবার, ধর্মপাশা উপজেলার চামরদানী ও দক্ষিণ বংশীকুন্ডা ইউনিয়নের ২৫০টি পরিবার, শাল্লা উপজেলার বাহারা ও হবিবপুর ইউনিয়নের ১৪টি পরিবার। তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট,বড়দল উত্তর, বড়দল দক্ষিণ, শ্রীপুর উত্তর ও শ্রীপুর দক্ষিণ,বালিজুরি ও তাহিরপুর সদর ইউনিয়নের ৩ হাজার পরিবার, দোয়ারাবাজার উপজেলার সুরমা ও সদর ইউনিয়নের ১১ হাজার পরিবার, ছাতক উপজেলার ইসলামপুর,নোয়ারাই,কালারুকা,দোলারবাজার ইউনিয়ন ও ছাতক পৌর এলাকার ১৯ হাজার ৩৯৬টি পরিবার ও জগন্নাথপুর উপজেলার ৫০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সদর উপজেলার ২৫ টি, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ১০০টি, ছাতক উপজেলার ৫০টি,দোয়ারাবাজার উপজেলার ৯টি ধর্মপাশা উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারসহ মোট ১৯৭ টি পরিবার এখন পর্যন্ত আশ্রয় কেন্দ্রে এসে ওঠেছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সুত্রে জানা যায়, ৩ হাজার ৭৬৫ হেক্টর আউশ ধানের জমি ও ১৮৮ হেক্টর বর্ষাকালীন সবজি ক্ষেত ঢলের পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। ফতেহপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রনজিত চৌধুরী রাজন বলেন, ফতেহপুর ইউনিয়নের চারশতাধিক কাচাঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার পানিতে ভিজে গো খাদ্য নষ্ট হয়েছে। কয়েক হাজার মানুষ পানি বন্দী অবস্থায় রয়েছেন। ধনপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হযরত আলী সুহেল জানান, ইউনিয়নের অসংখ্য পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। গ্রামীণ সড়ক গুলো বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়ে আছে। সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান খায়রুল হুদা চপল বলেন, সদর উপজেলার সুরমা ও জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়ন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এছাড়া লক্ষণশ্রী ইউনিয়নের গোচ্ছ গ্রামে বসবাসরত পরিবার গুলো আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের জন্য শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সুনামগঞ্জ পৌর সভার মেয়র নাদের বখত বলেন, পৌর এলাকার ৮০ ভাগ ঢলের পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। আবাসিক এলাকার সড়ক ও ঘরবাড়িতে পানি প্রবেশ করেছে। এছাড়া শহরের ধোপাখালী নবীগর এলাকার মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী স্লুইচগেইটটি পানির চাপে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সমীর বিশ্বাস বলেন, বিশ্বম্বরপুর উপজেলা নীচু এলাকায় বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। জেলা সদরের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। বিভিন্ন সড়কের উপর দিয়ে ঢলের পানি উপচে পড়ছে।

নিম্নাঞ্চলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এসব উপজেলায় কাঁচা ঘরবাড়ি, আউশের বীজতলা বর্ষাকালীন সবজি বিনষ্ট হয়েছে। পানি বন্দী হয়ে পড়েছেন লাখো মানুষ। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মোঃ সফর উদ্দিন বলেন, আউশ ধানের জমি ও সবজি ক্ষেতের পানি নেমে গেলে কোন ক্ষয়ক্ষতি হবে না। জমিতে গুলো যদি ৩/৪দিন পানিতে নিমজ্জিত থাকে তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ আবুল কালাম আজাদ জানান, কতো গুলো পুকুরের মাছ ঢলের পানিতে ভেসে গেছে তা এখনো জানা যায়নি। উপজেলা থেকে প্রতিবেদন আসলে জানা যাবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ সবিবুর রহমান বলেন, সন্ধ্যা ৬ টা থেকে রাত ৯ টা পর্যন্ত বৃষ্টি না হওয়ায় পানি ২ সেন্টিমিটার কমছে। তবে উজান বৃষ্টিপাত না হলে পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হবে। আগামী ৪৮ ঘন্টায় সুনামগঞ্জে আরও বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলা গুলোতে ৪১০ মেট্রিক টন চাল এবং ২৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া উপজেলাস মূহে ৪ হাজার ৭৫২ টি পরিবারের মাঝে শিশু খাদ্য বিতরণের জন্য বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে। উপজেলায় ও ইউনিয়ন পর্যায়ে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও পানি বিশুদ্ধকরন ট্যাবলেট প্রস্তুত করা ও প্রয়োজন অনুযায়ী সরবরাহ করা হয়েছে। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বিদ্যমান আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর তালিকা প্রস্তুত, যোগাযোগের নম্বর এবং আশ্রয়কেন্দ্র ভিত্তিক কমিটি করে দেয়া। জেলায় ৭৮ টি আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রয়েছে।

ত্রান ও উদ্ধার কাজে সহায়তা করার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে নৌযানের ও মাঝির ব্যাবস্থা করা এবং তাদের যোগাযগের নম্বর প্রচার করা হয়েছে। ত্রান ও উদ্ধার কাজে সহায়তা করার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে স্পিড বোটের ব্যাবস্থা করা হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে কারোও করোনা উপসর্গ থাকলে তাকে আলাদা স্থানে রাখার ব্যাবস্থা করা হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে সাবান, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও মাস্ক সরবরাহ করা হয়েছে। চিকিৎসা ব্যাবস্থা নিশ্চিত করার জন্য মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। জেলা দুর্যোগ ব্যাবস্থাপনা কমিটির মিটিং করে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

সুনামগঞ্জ ১ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বলেন, সরকার ও দল সব সময় দুর্গতদের পাশে রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থ প্রত্যেক পরিবারকে প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগিতা করা হবে।

Comments are closed.

আরো সংবাদ